Posts

Showing posts from March, 2024

ভোলগা নদীর খোঁজে – ৪৬ সামারা

Image
তলিয়াত্তি থেকে আমরা পথ ধরলাম সামারার দিকে। এটা আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। সামারা - সোভিয়েত আমলের কুইবিশেভ। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে এক সময় বর্তমান বুলগার শহরের নামও ছিল কুইবিশেভ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো থেকে এখানে স্থানান্তরিত করা হয়। স্তালিন নিজে মস্কো ত্যাগ না করলেও অনেক মন্ত্রণালয় এখানে সরিয়ে আনা হয়। এই শহরের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮৪ সালের গ্রীষ্মে। সেবার সবে মাত্র ভাষা কোর্স শেষ করে ছাত্র নির্মাণ দলে কাজ করতে আমরা যাচ্ছিলাম কাজাখস্তানের এক গ্রামে। এখানে দিনের বেলায় বেশ কিছুক্ষণ আমাদের ট্রেণ থেমেছিল। মস্কো থেকে ট্রেণে ওঠার পর এখানেই প্রথমে প্ল্যাটফর্মে নামার সুযোগ হয়। এখানেই প্রথম দেখেছিলাম বাবুশকা মানে বয়স্ক মহিলাদের আপেল, ঘরে তৈরি বিভিন্ন খাবার বিক্রি করতে। এরপর এখানে আসি ১৯৮৭ সালে দেশ থেকে ফেরার পথে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে আমাদের প্লেন কুইবিশেভ পাঠানো হয়। আমাদের ছোট বেলায় দেশে বিমান এত ঘনঘন উড়ত না। দুপুরে ঢাকা থেকে যে বিমান যেত কোলকাতার দিকে তার ছায়া পড়ত আমাদের উঠানে। আমরা বাচ্চারা হৈচৈ করে ছুটতাম ছায়ার পেছনে। কুইবিশেভ ল্যান্ড করার ...

ভোলগা নদীর খোঁজে – ৪৫ তলিয়াত্তি

Image
আমাদের পরবর্তী যাত্রা বিরতি ছিল তলিয়াত্তি। এই শহরকে বলা হয় রাশিয়ার ডেট্রয়েট। রাশিয়ায় বিভিন্ন শহরেই গাড়ি উৎপাদন করা হয়, তবে এটা মনে হয় একমাত্র শহর যেখানে গাড়ি শিল্পকে কেন্দ্র করেই চলে জীবন। প্রথমে একটু দ্বিধা ছিল দিলীপের যাবে কি যাবে না। আমি আর দেমিদ একটু জোর করেই নিয়ে গেলাম। এখানে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল গাড়ির মিউজিয়াম দেখা। শহরের গোড়াপত্তন করা হয় ১৭৩৭ সালে। ভাসিলি তাতিশেভ যাযাবরদের হাত থেকে রুশ ভূমি রক্ষা করার জন্য স্তাভ্রোপোল নামে এই দুর্গ শহর গড়ে তুলেন। এই শহর প্রতিষ্ঠার আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণকারী কালমিকির লোকদের নতুন বাসস্থানের ব্যবস্থা করা। ১৭৩৭ সালের ২০ জুন সম্রাজ্ঞী আন্না ইয়ানভনা খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণকারী কালমিকির রানীকে এই নতুন শহরের গোড়াপত্তনের খবর জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। সেদিন থেকে শুরু হয় শহরের ইতিহাস লেখা। ১৭৪৪ থেকে ১৭৮০ সাল পর্যন্ত এই শহর ছিল অরেনবুরগ প্রদেশের অংশ। বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত প্রায় একশ বছরে জনসংখ্যার তেমন পরিবর্তন হয়নি। সেখানে ৬ হাজারের মত মানুষ বাস করত আর সে সময় স্তাভ্রোপোল ছিল রাশিয়ার মাঝারি মানের শহর। কিন্তু স্তাভ্রোপোল অঞ্চলে প্রায় ২৫০ হাজা...

ভোলগা নদীর খোঁজে – ৪৪ ইতিহাস ও গির্জা

Image
উলিয়ানভস্ক থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম সামারার দিকে। পথে অবশ্য তলিয়াত্তিতে যাত্রা বিরতি। ইতিমধ্যে আমরা মস্কো থেকে অনেক দক্ষিণে চলে এসেছি। শুরু হয়েছে ফসলি মাঠ। তবে ইতিমধ্যে ফসল প্রায় সবই তুলে নেয়া হয়েছে। মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছে শীতের জন্য। এখন এখানে বীজ বপন করা হবে। পুরু বরফের স্তরের নীচে ঢাকা থেকে ওরা যখন অঙ্কুরিত হবে তখন চারিদিকে বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন আমরা এগিয়ে চলছি, দিলীপ মুখ খুলল। আচ্ছা, গির্জা বা উপাসনালয় দেখলেই তুমি ছবি তুলতে যাও কেন? তুমি তো মনে হয় এসব বিশ্বাস করা না। ছোটবেলায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করতাম। একাত্তরের যুদ্ধের সময় কলাগাছের ডগা দিয়ে প্রতিদিন কালী ঠাকুর বানিয়ে পূজা করতাম। একদিন আমাদের আশ্রয়স্থলে যখন রাজাকার এলো আর সব লুট করে নিয়ে চলে গেল, একটা কৌটায় আমার জমানো চাল দিয়ে সে রাতের খাবার হয়েছিল সবার জন্য। স্কুলে পড়ার সময় রাম সেজে কত কলা আর পেঁপে গাছ যে তীর ছুঁড়ে বধ করেছি তার ইয়ত্তা নেই। পরে অবশ্য এসব থেকে বিশ্বাস উবে যায়। বাম রাজনীতির সাথে জড়িত হলে এক সময় তোমাদের মত তীব্র ঈশ্বর বিরোধী হই। পরে বুঝি বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দুটোই বিশ্বাস, প্রমাণহীন। ...

ভোলগা নদীর খোঁজে – ৪৩ লেনিন মিউজিয়াম

Image
পরের দিন সকালে আমরা গেলাম লেনিনের হাউজ মিউজিয়াম দেখতে। কিছুদূর গিয়ে চোখে পড়ল প্রচণ্ড সুন্দর এক গির্জা। নীল–সাদা মাঝে সোনালী গম্বুজ একেবারেই অন্য রকম লাগছিল। আর আকারেও ছিল দশাসই। ব্যস্ত চৌরাস্তার মোড়ে ও যেন হাত নাড়িয়ে ডাকছিল আমাদের। আমি সাথে সাথেই দেমিদকে বললাম গাড়ি থামাতে। বেঁকে বসল দিলীপ। ও কিছুতেই নামবে না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল আমি কয়েক মিনিটের জন্য নেমে ছবি তুলে ফিরে আসব। এটা ছিল স্পাসো-ভজনেসেনস্কি কাফেদ্রালনি সাবর। জানি না দিলীপ না নেমে কিছু হারিয়েছে কিনা, তবে এতে যে ওর কোন লাভ হয়নি সেটাও সত্য। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০ বছর আগে হেরাক্লিট বলেছিলেন একই নদীতে দুইবার নামা অসম্ভব। আমার ধারণা শুধু তাই নয়, একই বই দুই বার পড়া অসম্ভব, যেমন অসম্ভব একই শহরে দুইবার আসা, একই কাজ দুইবার করা। কেন? কারণ প্রতিটি মুহূর্তে বদলায় পারিপার্শ্বিক অবস্থা। আমার বেশ কিছু প্রিয় ছবি আছে। কিছু মস্কোয় তোলা, কিছু দুবনায়। অনেক বার চেষ্টা করেছি সেসব ছবি নতুন করে তুলতে, মূলত অপেক্ষাকৃত ভালো ক্যামেরা যখনই হাতে এসেছে। কিন্তু একটি ছবিও এমনভাবে তুলতে পারিনি যাতে সেটা অবিকল আগেরটার মত হয়, সেটা হয়েছে একেবারেই নতুন ছবি। কারণ ...

ভোলগা নদীর খোঁজে – ৪২ উলিয়ানভস্ক

Image
যারা গোর্কি বা রুশ সাহিত্যের সাথে পরিচিত তারা সিমবিরস্কের নাম শুনে থাকবেন। এমনকি লেনিন সম্পর্কেও লেখা যে তিনি ১৮৭০ সাথে সিমবিরস্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে যখন বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম তখন এটা ছিল তীর্থ ক্ষেত্রের মত। কিন্তু পরে দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলে সেই আবেগে ভাটা পড়ে। বেশ কয়েকবছর আগে এখানে রাশিয়ান গ্র্যাভিটৈশনাল সোসাইটির কনফারেন্স আয়োজিত হলে উলিয়ানভস্ক আসার সুযোগ আসে, তবে বিভিন্ন কারণে সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কি এজন্য নিজের প্রতি একটু ক্ষোভও আছে আমার। উলিয়ানভস্ক ভোলগা ও সভিয়াগি নদীর তীরে ভোলগাতীরের মালভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। মস্কো থেকে ৭১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই শহর উলিয়ানভস্ক অঞ্চলের রাজধানী। ২০১৫ সাল থেকে উলিয়ানভস্ক ইউনেস্কো স্বীকৃত রাশিয়ার একমাত্র সাহিত্য শহর। ১৬৪৮ সালে জার আলেক্সেই মিখাইলোভিচের নির্দেশে বগদান খিত্রোভ নোমাড বা যাযাবর জাতির আক্রমণ থেকে রুশ সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত রক্ষার জন্য এখানে দুর্গ নির্মাণ করেন। সে সময় এই শহর সিনবিরস্ক নামে পরিচিত ছিল। এই নামের পেছনে বিভিন্ন যুক্তি ঐতিহাসিকগন খোঁজার চেষ্টা করেন। কারো কার...